কবিতা : রঞ্জন ভট্টাচার্য



অক্ষমতা 


যতবার তোমাকে আঘাত করেছি, সচেতন ভাবেই করেছি। অথচ পূর্ব পরিকল্পনায় ছিলনা কোন শূন্যের অহঙ্কার। প্রতিটি আঘাতে শক্ত হয়েছে হৃদয় তহবিল। আজলা ভরে নিয়েছি যা ফিরিয়ে দেইনি। সাদা পাতার বুকে কাটা কম্পাসের আঘাত বিদ্যমান। ঝুড়ি চাপা বন্দি পাখি, আগল ভেঙে পালাতে পারেনি। কুড়োতে পারেনি দ্বিধাহীন সামান্য উপহার। ছেঁড়া খাতা সেলাই করিনি আজও।

 বনময় ভেজা আলস্য এসে উকি মারে। আলোছায়ায় রহস্য আছে জানি। অথচ ভাবতে পারিনা কিছুই। আভাস এসেছে কিছু। ব্যার্থ হয়েছে গোল হয়ে বসার পরিকল্পনা। 

তবু তোমাকে ডিঙিয়ে এসেছে যে রোদ ছায়া ছায়া বেড়ে ওঠা আবোল তাবোল, তাকে আমি সম্মান করি 

স্বীকার করি না।




অস্থায়ী জীবনের শর্ত 


সম্ভাবনার বাসর সাজিয়ে পারদ ওঠানামা করছে।
তুমি চলে যাওয়ার আগে ঘন্টা বাজিয়ে চলে গেলে
আমি আঘাত সরিয়ে পাইনি জীবনের হাতছানি 
জানি সময়ের অগোচরে উকি মারে ব্যর্থ জীবন 
জীবন তরঙ্গে তারা মাত্র অনাহূত জীব
প্রাচীন বিচারালযের ঝিমানো আসামী 
রাগ নেই ক্ষোভ নেই ভরসা নেই কোনো 

বেচে থাকার দুঃখ বাড়তে থাকে ফোটা ফোটা 
দিনের শুরুতে হাঁটুতে ভুমিকম্প নিয়ে কেপে ওঠে ছোটলোকের জাত

দেখতে দেখতে আমার সব অনুভূতি শেষ হয়ে যায় 

এবার অন্তত সরকারী বেসরকারি সমস্ত অস্থায়ী কর্মীবর্গ, 

আমি কল দিচ্ছি :

চলুন আমরা প্রকাশ্য রাজপথে চিৎকার করতে করতে প্রাণ হারাই।




স্পষ্ট 


ওরা আমাদের মাথা টিপ করে ঢিল ছুঁড়ে মেরেছে। বোমার আঘাতে আঘাতে ক্ষতবিক্ষত করেছে। গলাটিপে ধরে ভিখিরি করেছে। প্রতিদিন আমাদের চিন্তা ভাবনা টিপে টিপে মারছে। ইচ্ছেমত নিজেদের কথা বানিয়ে বানিয়ে সাংবাদিকের মুখ দিয়ে উচ্চারণ করাচ্ছে। আমার মেধাবী বন্ধু দ্বিধাবিভক্ত হয়ে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে। আমার মা বিনা বেতনে, খালি পেটে  রাস্তার নর্দমা পরিষ্কার করতে গিয়ে গ্যাসের ব্যথায় মরছে। আমরা ওদের বিরুদ্ধে নাকি সপক্ষে বুঝে ওঠার আগেই, আনন্দবাজার ছবিতে ছবিতে ভরে যাচ্ছে শাসকের নারকীয় মুখে। আমরা আবার তা ধিন তা ধিন করে নেচে উঠছি অদৃশ্য তিনহাজার টাকার বিনিময়ে। পৌরসভা থেকে আমাদের বালতি দিয়েছে নোংরা পরিষ্কার করার জন্য। একটা বালতির বিনিময়ে স্পষ্ট করে বলে গেছে ভোট দিতে গেলে কান কেটে নেবে। কল্যাণী স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত মাষ্টার মশাই আর তার একমাত্র মেয়ের কাটা কান আমাদের ভয়ের একমাত্র কারন। তবু আমরা গাছ হয়ে কুঠারের হাতলের সপক্ষে স্পষ্ট উচ্চারণ করছি। 

আর পৃথিবী গোল প্রমাণ হয়ে যাচ্ছে।




শব্দ অচেনা শূন্য 


যে শিশু বসে আছে নিশ্চিত বর্গক্ষেত্র একে 
দিন বয়ে যায় ক্ষেত্রফল মেলে না 
শূন্যের রীতিতে বাঁধা যে দিকচক্রবাল 
তাকে ধরে কেবল মাতৃ জঠরে থাকা শিশু 
ঘরের ভেতরে ও বাইরে তার অন্ধকার আলো 
বোজা চোখে ধরা পরে যে ফুল 
তাকে ফোটাবে তুমি কোন অচেনা শরীরে 
ছায়াময় মায়াময় শরীর তোমার 
পুরেছে যে দিন 
সেইদিন হে প্রিয় ধরেছি এই হাত 

হাতচিহ্ন লেগে আছে মাথায় আমার




সর্বনাশ


জানি এবেলার তর্কাতর্কি ঘিরে বেধে যাবে কোলাহল। এখান থেকেই তুমি আমার সাথে কথা বলা বন্ধ করবে। তোমার ব্যাবহার করা শব্দে হানবে আঘাত। তবু যুক্তির পাহাড়ি পথে বসে থাকি নিরালায়। তোমার অযৌক্তিক জানালার গা বেয়ে ঝরে পড়ে মানুষ বিচ্ছেদের অনুবাদ। তবু আমি থেমে নেই। তুমি ছেড়ে গেলে, একে একে সব মিছিল আমাকে ছাড়িয়ে চলে যাবে জনতার উল্লাসে। 

এদিকে আমি ক্ষুধার্ত অসহায়, অধর্মের দানাপানি মুখে নিয়ে মুছে যাই সর্বনাশ।
তুমি এই সরল অঙ্ক বুঝবে না কোনদিন...




সৌন্দর্যতত্ত্ব


তোমার অপরুপবাদত্ত্ব পৃথিবীর বুকে প্রতিষ্ঠা হতে দেবো না কখনোই
যেনো আমারও অধিকার আছে জলে ও নিষ্ফলে

এক প্রচন্ড বাতাস এসে উড়িয়ে নিয়ে যাবে আমাদের
ছাড় পাবে না তুমিও হে রাজন

উড়ে যাবো এক নতুন গোলকে
যেখানে তোমার আমার স্পর্শের মধ্যে থাকবে
সামান্য খাদ্যের অধিকার
আর
নির্জনে বসে থাকা দূর সীমান্তে চেয়ে




আবেদনপত্র

ভাবনার আড়ালে দিন যাপনের গল্প জেগে আছে। একফালি পৃথিবী রুষ্ট হয় নি আজও। একটা ঝোপের পা ধরে ক্ষমা চেয়ে নেওয়ার দিন আজ। ভোরের ধ্যান মগ্ন স্তব্ধ কোলাহলের কাছে হাত পেতে ভিক্ষা চাই। তুমি এসেছ! হে সবুজ হে ভালো পাহাড়ে পাহাড় আমাকে নিয়ে যাও। আমার ঔদ্ধত্য আজ তোমার করতলে বিসর্জন দেবো। হে নির্দয় আমাকে কাঁদাও সর্বসান্ত করে দাও আমায়।

ইচ্ছে হলে দুর দুর করে তাড়িয়ে দিতে পারো। একবুক মেঘলা আকাশের গায়ে গা লাগিয়ে কপাল চাপড়াই। হে বৃক্ষনাথ আমার প্রিয়জনকে দেখিয়ে দিও না আমার স্বরুপ। আমি বড়ই লজ্জিত। মুখ দেখানোর মতো কিছুই নেই আমার।

তবু এই বনপ্রান্তে দুখঃসুখের চিরকালীন আবেদন ;
একটা ছোট্ট গাছের পাতা করে দাও আমায়।

তুচ্ছ মানুষ হয়ে তোমার সাথে আলাপ হওয়ার সব রাস্তাই আজ বন্ধ হয়ে গেছে।




বারোটা বাজতে দুই


বারোটা বাজতে আর মাত্র দুমিনিট বাকী। আর দুমিনিটে শেষ হয়ে যাবে দুনিয়াটা। শেষ হয়ে যাবে আদরের সন্তান। তার আগে শেষ কবিতা লিখে যেতে চাই। আজ জল ভরে রাখতে হবে গামলায়। শেষ মূহুর্তে কিছু মানুষ জলের জন্য হাপিত্যেশ করবে। এতদিনে মাত্র তিনটে গাছ লাগিয়েছি। দুটো বড়ো হয়ে গেছে, একটা আম গাছ এখনও ডানা মেলতে পারেনি। এই বিপুল মানুষের বুকে তারা অক্সিজেন দিতে পারবেনা। তারা নির্বাক নিস্তব্ধ। বড়ো মুষরে পরেছে আজ। আমাকে অবিরাম দোষারোপ করছে। মুখ তুলে কথা বলতে বারণ করেছে। কান পাতলে শুনতে পাচ্ছি মাটি চাপা জলের আর্তনাদ। কি ভীষণ হাহাকার তাদের। একটু একটু করে মাথার ভিতরে গাছের শিকড় ঢুকে যাচ্ছে। আমি অ্যালুমিনিয়ামের তার পাওয়ার নেশায়, প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে উন্মত্ত হয়ে ভেঙেছি পাখির বাসা। ইঁদুরের লেজে সুতো বেঁধে ত্রিভুবন দেখিয়েছি। একটা একটা করে ফড়িংয়ের পাখনা ছিঁড়েছি। উপভোগ করেছি তার ল্যাংড়ানো।

শেষ করে দেওয়ার খেলায় আমিই প্রথম।
আমি পুরস্কার পাবো। তোমরা একটু প্রচার করো।
শেষের সেদিন আমি পুরস্কার আনতে যাবো।

হাততালি দিয়ে উৎসাহিত কোরো আমায়




আদাব


এখনই তোমাকে কাঁদানোর সময়। জানি তোমার চোখের জলে আমার লিকলিকে আম গাছে নতুন পাতা জন্মাবে। সেই ভোর রাত থেকে আমার অবাধ্যতা সহ্য করতে হয়েছে তোমাকে। আমার অসহ্য জীবনের নৌকা ডুবে যাচ্ছে। জলের ইতিহাস সহজ কথায় লিখে রেখে যাবো। গাছের অস্বাভাবিক মৃত্যু লিখে রেখে যাবো। অর্থহীন এইসব প্রলাপ বুকে মতবিরোধ তীব্র হবে। শিশু মৃত্যুর পরিসংখ্যান পালকের মতো সুড়সুড়ি দেবে মুখে। একদিন তোমার টাকার বাগানে মৃত শিশুর স্তুপ দেখে, একটু গা শিরশির করে উঠবে। আজ ঝড় উঠতে পারে। খাবার চেয়ে রক্তক্ষয়ী আন্দোলন হতে পারে। সত্তর বছর ধরে দেখছি ক্ষুধার্ত শিশুর বুকে দাড়িয়ে পালোয়ান প্রধানমন্ত্রী। হে প্রধানমন্ত্রী আমার সহনাগরীক বুদ্ধিমান এবং বোকাচোদা টাকার মালিক। আদাব জানাই তোমাদের।


 

বৃক্ষমানব


গাছের সাথে রক্তমাংসের বন্ধু আলাদা করা গেল না। এই প্রবল গরমে বন্ধু-কুয়াশা গায়ে মেখে নেওয়া যায়। একা চিঠি ইথার তরঙ্গে, ওরে মেঘদূত ওরে প্রাণ হন্তারক ভাসানোর আগে ভাবো। ভেবে ভেবে নতুন নাম দেওয়া চাই। নাম ঘোষনার আগেই সাদা ধবধবে পাতায় রঙচঙে পুরস্কার। কে হাততালি দেবে আজ! জলের বুকের থেকে শ্যাওলা আলগা হয়ে যাবে! জানি বুকের নোনাজল ক্রমশ ধারালো হচ্ছে। গুছিয়ে বলতে শেখার আগেই পরোতে পরোতে সাজিয়ে রেখেছো প্রত্যাশা পুরনের আশ্চর্য চাবি। ছলে বলে খুলে দাও জাগতিক দরজা অসীম। পাতায় পাতায় পড়ে থাকি আমি, আর তুমি আশ্চর্য অকারণ সাহসী মেজাজ। আর সব অশরীরী প্রধানমন্ত্রী মুখ্যমন্ত্রী নাম। যেখানে দশ লক্ষ প্রাণের আকুতি আমাদের নাম ধরে ডাকে! গুছিয়ে বলেনি সাজাতে জানে না। জানে না অদৃশ্য প্যাচ পয়জার। দানবীয় ভালোবাসা এলোমেলো ছরানো ছিটানো সমবায় সরল সমিতি। পন্ডিতগন এসবের কিছুই বোঝেনা। গোছা গোছা বই নিয়ে থম মেরে থাকে আর উই ধরে মাথায় তাহার।

আমরা আক্রান্ত হই জংলী ফুলের গন্ধে কমল বাবুর বাসার আশায়।

Share this:

ABOUT THE AUTHOR

Hello We are OddThemes, Our name came from the fact that we are UNIQUE. We specialize in designing premium looking fully customizable highly responsive blogger templates. We at OddThemes do carry a philosophy that: Nothing Is Impossible

0 comments:

Post a Comment

সম্পাদক : শুভদীপ সেনশর্মা
সহ-সম্পাদক : মৌমিতা পাল