কবিতা : বিশ্বজিৎ মাহাত



তুমি ও বিষাদনিক্বণ 




প্রতিটি শোকের বুকে ছিপ ফেলে বসে আছে শোক 
কেউ বা সাঁতার মুখে জ্বেলে রাখে বিষাদ পূর্ণিমা 
কেউ বা হাওয়ায় একা অবকাশে চিঠির বাহক 
কান্নাকে কবুল করো হৃদয়েই পুঁতে যাবো সীমা 

শোকের বোধনলীলা আপাতত সাগরের দিক 
ভ্রাম্যমাণ সশরীরে উল্লসিত শঙ্খ সার সার 
কুড়িয়ে রেখেছি ব্যথামালা আর নৈঃশব্দ অধিক 
জতুগৃহে নিয়ে এসো স্বচ্ছ কিছু প্রণয়-শিকার 

লৌকিক ঝর্ণার নীচে মৃত স্বপ্ন, স্বপ্নের শরীর 
কে শুধু আবেগ-জলে দেহ থেকে তুলে নেয় রোগ 
ও লতা, আমায় বটবৃক্ষ ভেবে প্রেম করবে ধীর 
সমূহ গোলাপ ক্ষেত ব্যথা পেলে ফুটবে কি বিয়োগ 

ব্যথাকে আয়নায় ধরো যদি নামে অদৃষ্ট সংসার 
হৃদপিণ্ড হাতে তোলো, স্তব্ধ হও দেহ, নিরাকার 






হৃদপিণ্ড হাতে তোলো, স্তব্ধ হও দেহ, নিরাকার
কোথাও বিনম্রমেঘ দান করে ঊর্বশীয় জ্বর 
কোকিল ডেকেছে কুহু সামান্য মনের বিদ্ধদ্বার 
কুটি কুটি জানালায় দগ্ধ রক্ত, কেঁদেছে ঈশ্বর

গোপনে হৃদয় তুলে শিরা স্তরে বহমান জল 
একে কি শিশির বলি, যে ঘাসের মাথায় নেচেছে 
হে শূন্য, সন্দেহ! বাঁশি পরিচিত বাঁশুরির ছল 
ফুঁ দিয়ে বিস্তারে ঘাত গুহাময় শরীর এঁকেছে

সংস্কৃতি, স্নেহের প্রথা কোনো পাশে খাদ নেই, প্রিয় 
তোমার হৃদয়, দেবী নিয়ন্ত্রণে বিমূর্ত জীবন 
শঙ্খের সাঁতারে লোভ তবু, বধূ ঠোঁট আত্মক্রিয় 
স্থিরদৃষ্টি মোহমদ এ-শরীর মেনেছে হনন 

হৃদপিণ্ড হাতে তোলো, কেন সত্য, অস্বীকার করো 
শরীর সর্বদা বলিকাঠ, চায় প্রেম, ক্ষত আরও 






শরীর সর্বদা বলিকাঠ, চায় প্রেম, ক্ষত আরও 
অঙ্গুরীর মূর্তস্থানে গোপনে ফুটেছে ব্যথাতারা 
হাঁদামুখী হত্যাকারী চাঁদ রূপতন্ত্রে জ্বালে কারো 
হৃদয়। নক্ষত্রযোগ দেখে বশীভূত এ-দোতারা 

নেউল জীবন চায়, রতি, ক্ষোভ, যুদ্ধের প্রস্তাব 
পরশ পাথর, তুমি কখনও-সখনও ছুঁয়ে যাও 
ফুসফুস, স্নায়ুঋষি, ভালোবাসি প্রতিকূলভাব 
মোহের দোহাই বৃন্দাবনে নয় হৃদয়ে কোপাও 

দেহ মাঝে ধোঁয়া ওঠে স্তরীভূত ছন্দের স্বভাব 
পাশাপাশি ভাগ করি শারীরিক যা কিছু বিয়োগ 
নেকড়ের মতো গর্জে মাটিবাহী চোখের বিভাব 
অশ্রুও উলঙ্গ প্রিয়,উদাসীন বেহায়াও এক 

তোমাকে দিয়েছি প্রেম, দগ্ধ বুক, বিশ্বাস-বেদনা 
তথাপি নসিব মেনে বুকে ধরব কখনও ছাড়ব না







তথাপি নসিব মেনে বুকে ধরব কখনও ছাড়ব না
ফুসলিয়ে বাহুদ্বয়ে দুটি বুক ফোঁস দিতে দিতে
বিষ ঢালব উভয়ের ঠোঁটে জেগে উঠবে প্রিয় ওড়না
তার নীচে অস্তিত্ব ও এক আত্মা জন্মিবে ইঙ্গিতে

অনন্তে টাঙানো হবে ঝুমকো, চুম্বনের প্রতিচ্ছবি
ক্ষেতময় রাধিকার স্তনরাগ, ক্ষত চুঁইয়ে নামে
শরীর, পরমেশ্বর! বাঁচাবে এখন সুর যদি
তৎকালে তুমি জয়ী, প্রশমিত হবে, ধ্বংসে যাবে

তথাপি নসিব জানি যেটুকু গড়েছি নম্রমূর্তি
আমিও মাটির প্রেমী কেন এত বিক্ষত করেছি
নতুন মানবীছায়া তবু দাও ভ্রুণের আকৃতি
স্পর্শের দ্যোতনা, নেশা, পান করি আগ্নেয় চোখে কি?

অশ্রু, এক দিব্যনারী, সে আমাকে বাঁচাবে এখন
প্রেম ও ব্রহ্মের কাছে বিষাদ পাঠাব এতক্ষণ







প্রেম ও ব্রহ্মের কাছে বিষাদ পাঠাব এতক্ষণ
উস্কানি ব্যতীত কিছু পীঠস্থান খোলা রাখে দেহ
সেখানে সংশয় ঝুলে পাখিজন্ম আমার জীবন
জোনাকি গর্ভের জলে আলোপুঞ্জ আর নষ্টস্নেহ 

কাচি বা চাকুর ধার, সহিষ্ণু সহ্যের প্রেমালাপ
কুচি কুচি রক্ত কণা নিমেষে প্লাবিত নগ্ন ব্যাধি
টেবিলে ল্যাম্পের স্নায়ু, মৃত প্রায় ধুকপুক শ্বাস
কলম ও খুলি চুপ, ও সখী, ও ব্রহ্ম, এসো সুধী

কবোষ্ণ হৃদয় কুঁজে বিহ্বলতা কে কত দেখেছি
কত জ্যোৎস্না! শান্ত চোখ! গড়িয়ে দিয়েছে অশ্রুহ্রদ
এ-হীন আঙুল, প্রিয় প্রতিচ্ছবি, সিঁথি রাঙিয়েছি
সমুদ্র বা সংঘর্ষের মাঝে ফেলে আসি চর্যাপদ

আমার বিষাদ, পান, যতই চিবোও, তত লাল
মরচের কুটিরে দেখি সন্দেহে সংশয়ে এ-আখ্যান







মরচের কুটিরে দেখি সন্দেহে সংশয়ে এ-আখ্যান
শরীর, গুহার ন্যায়, যত জ্বালব চিঙ্গারির কণা
দেখো স্মৃতি, উস্কে ওঠো, শোনো মেয়ে স্নায়ুচিত্রগান
যদি বা হদিশ পাই, শুষ্কমুখ ধাতব অঙ্গনা

রন্ধ্রে রন্ধ্রে পালাব না, গড়ে দেবো অশ্রুর গহনা
এমন প্রপাতমুখে ভিজে চুল, জোয়ারের হৃদ
স্মৃতিকে আগুনে ফেললে মৃদু কাঁদে উল্কার মোহনা
কুঁড়ি ও স্মৃতির কাছে, তুমি শিশু, সারল্য অঙ্কিত

বিদগ্ধ গ্রামীণমূর্তি, সাড়হীন ধুতুরার টব
জাদুবিদ্যা, গৃহকাজকর্মহীন মেয়েটি তাকায়
সমস্ত স্মৃতির দায়, ফণা, বিষ, প্রেমের গৌরব
যে স্মৃতিতে প্রেম নেই মহৌষধ নিয়ে কেন যায়?

আর নয়, এ-দংশন পুষে রাখে সাপুড়িয়া মন
বিষ তুলি, রক্ত ওঠে, স্মৃতিও জিহ্বায় ঝলমল







বিষ তুলি, রক্ত ওঠে, স্মৃতিও জিহ্বায় ঝলমল
ভিতরে, অনন্তে নড়ে দৃশ্যাতীত জ্যোৎস্নার ফুল
অবয়ব ফুটে ওঠে, লক্ষ্যে তুমি তৃপ্ত হও জল
পাথুরে চোখের নীচে, নেতিয়ে পড়েছে ব্রহ্মকূল

যে সূর্যের অস্ত নেই সে ভ্রান্ত আমার গোপবালা
উজ্জ্বল কবিতাবর্ণ দেহের গড়ন, ইঞ্চি মাঝে
সহজ শোক ও সুর নাভিস্থলে চিরপঙক্তিমালা
স্পষ্ট বা প্রতীকময়, মুগ্ধতাও ভণ্ড শিব সাজে

জীবন, দীঘির জল, আবছায়া হয় মৃদুপর
শুধু খুঁড়ে খাই পাঁকপদ্মস্তন। বিমূর্ত নারীটি
শত প্রতিমার মতো চেয়েছে যে সিঁদুর-আকর
এখন হৃদয় কুঞ্জে দ্ব্যর্থভাষা ফেরাও, অতিথি

মধুর ব্যতীত ভোমরা অচল রেখেছে যোগাযোগ
প্রতিটি শোকের বুকে ছিপ ফেলে বসে আছে শোক

Share this:

ABOUT THE AUTHOR

Hello We are OddThemes, Our name came from the fact that we are UNIQUE. We specialize in designing premium looking fully customizable highly responsive blogger templates. We at OddThemes do carry a philosophy that: Nothing Is Impossible

2 comments:

সম্পাদক : শুভদীপ সেনশর্মা
সহ-সম্পাদক : মৌমিতা পাল